একজন শিক্ষক এবং জাতির মূল্যবোধের অবক্ষয়

গত এক সপ্তাহ জুড়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে একই ইস্যু। সাধারন ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে সেলিব্রিটিরাও বিভিন্নভাবে লিখালিখি করে যাচ্ছেন, গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমান দ্বারা হেনস্তা হওয়া নিয়ে। ভিন্নজন-ভিন্নমত, ঠিক তাই দেখছি সপ্তাহজুড়ে। কেউ লিখছেন একজন শিক্ষককে হেনস্তা করা মোটেই ঠিক নয়, কেউ লিখছেন সরকারের বিরুদ্ধে, আবার কেউ বলছেন ইসলাম অবমাননাকারীদের এভাবেই শাস্তি হওয়া উচিত। অনেকেই আবার নিরব প্রতিবাদ শুরু করেছেন, অসহিংসভাবে কানে ধরা ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  দিয়ে।

কমবেশি সবাই  সেদিনকার ঘটে যাওয়া ঘটনার একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। সে ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছিল স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমান এমপি, ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে কানে ধরিয়ে উঠবস করাচ্ছেন, শিক্ষক কানে ধরে উঠবস করার এক পর্যায়ে মেঝেতে পড়ে যান, এবং তারপর তাঁকে জনতার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে বললেন এমপি এবং সেই শিক্ষক ঠিক তাই করলেন।

ঘটনাটি নিয়ে মোটামোটি সবগুলো সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে বর্ণনা করেছে বিভিন্ন তথ্য, উপাত্ত ও সাক্ষাতকার নিয়ে। এবং সব গুলো সংবাদ দেখার পর যা বুঝলাম, ঘটনাটি মোটামোটি এরকম ছিলোঃ একদিন ওই স্কুলে ক্লাশ চলাকালীন সময়ে দশম শ্রেণীর ছাত্ররা ভীষণ চেচামেচি করছিলো, এবং তখন হঠাত করে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক এসে হাজির হন এবং রিফাত নামের এক ছাত্রকে প্রহার করেন। পরদিন সেই ছাত্র স্কুল কমিটির কাছে নালিশ নিয়ে যায় এবং স্কুল কমিটি প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত-কে মিটিং-এ ডাকে, এবং ঠিক ওই সময়ই পাশের মসজিদের মাইকে কেউ একজন ঘোষণা দেন, শ্যামল কান্তি রিফাত নামের ছাত্রকে মারধোর করেন এবং তাকে ইসলাম ও ইসলামের নবীকে নিয়ে কটুক্তি করেছেন এবং সবাইকে স্কুল প্রাঙ্গনে একত্রিত হয়ে শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান। সাথে সাথে স্থানীয়রা পিয়ার সাত্তার স্কুলের সামনে চলে আসে এবং সেই শিক্ষককে মারধোর শুরু করে, এক পর্যায়ে স্কুল কমিটির লোকজন শ্যামল কান্তিকে স্কুলেরই একটি কামরাতে আটকে রেখে স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমান এমপিকে খবর দেয়। বিকেলের দিকে সেলিম ওসমান ঘটনাস্থলে আসেন, এবং শ্যামল কান্তির বক্তব্য অনুযায়ী তাঁকে আটকে রাখা কামরাতে গিয়ে সেলিম ওসমান তাঁর গায়ে হাত তোলেন এবং এক পর্যায়ে বাইরে বের করে এনে স্থানীয় লোকজনের সামনে কান ধরে ওঠবস করার আদেশ দেন, শিক্ষক সেলিম ওসমান এর আদেশ অনুযায়ী কয়েকবার কান ধরে ওঠবস করার পর মেঝেতে পড়ে যান, এবং তারপর তাঁকে সবার সামনে হাতজোড় করে মাফ চাইতে বলেন সেই সাংসদ। কিন্তু ওই ঘটনার পর, এক টিভি সাংবাদিক সেই স্কুল ছাত্র রিফাতের সাক্ষাৎকার নেন, এবং সেই সাক্ষাৎকারে রিফাত নিজের মুখেই স্বীকার করে নেয় যে, প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ধর্ম নিয়ে কোন কটুক্তি করেন নি, কিন্তু তাকে মেরেছেন, এবং এই কারনে তার পরিবার স্কুল কমিটির কাছে প্রহার করার অভিযোগ করেছিলো। এবং দেখা গেলো ওই ঘটনার পরদিন শ্যামল কান্তিকে বহিস্কার করা হলো স্কুল থেকে। যদিও মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রির আদেশে করা তদন্ত কমিটি বলছে ভিন্ন কথা, তাঁরা বলেছেন ওই স্কুল কমিটি অবৈধভাবে শিক্ষককে বহিস্কার করেছেন এবং তাঁর নামে আনা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ অসত্য। এবং ওই স্কুল কমিটিকে বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এই ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর দেশবাসী কয়েকদলে ভাগ হয়ে যায়। আমি এই ভাগ হয়ে যাওয়া কিছু সংখ্যক মানুষের চিন্তাচেতনা, কর্মকাণ্ড নিয়ে এবং তাদের নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করবো।

আমি এঁদেরকে, তাঁদের চিন্তা চেতনা অনুযায়ী কয়েকটি শ্রেনীতে ভাগ করেছি এবং প্রথম ৩ টি শ্রেনীর চিন্তা তুলে ধরার চেষ্টা করবোঃ

১. প্রথম শ্রেনীঃ একজন শিক্ষককে হেনস্তা করা মোটেই ঠিক হয়নি। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। এভাবে জনসমক্ষে একজন শিক্ষকের অপমান মানে সকল শিক্ষকের অপমান। (সাথে কিন্তু ভিডিও শেয়ার)

২. দ্বিতীয় শ্রেনীঃ সেই শিক্ষক হিন্দু ছিলো, তাই তাঁকে হেনস্তা করার সাহস পেয়েছে, একজন শিক্ষকের অপমান করা মানে পুরো শিক্ষক জাতির অপমান। (সাথে কিন্তু ভিডিও শেয়ার)

৩. তৃতীয় শ্রেণীঃ শাস্তি হয়েছে খুব ভালো হয়েছে, ইসলাম অবমাননাকারীদের এভাবেই সকলের সামনে কানে ধরে উঠবস করানো উচিত, সেলিম সাহেব যা করেছেন, খুব ভালো করেছেন। (উনারাও সাথে ভিডিও শেয়ার করেন)

সব ঘটনা দেখে এবং শুনে খুবই আশ্চর্য হলাম। যারা শ্যামল কান্তির পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন বা বলছেন, তারা প্রশ্ন তুলেছেন একজন শিক্ষকের অপমান নিয়ে, অথবা তাঁর হিন্দু হওয়ার কারনে তাঁর অপর অত্যাচার হয়েছে এবং লাঞ্ছিত করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেই মনের অজান্তেই সেই ঘটনার ভিডিওটি শেয়ার করেছেন। এবং এভাবে ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে সেই শিক্ষককে নিজেরাই আবারো অপমানিত করলেন। আমি দেখলাম আর মনে মনে হাসলাম, শিক্ষককে নিয়ে যদি এতো কন্সারন, তাহলে কেনো শুধু শুধু এই ভিডিওটি ছড়ানো?

আরেকটি বিষয় ভেবে আমি প্রথম দিন থেকেই অবাক, কেউ একটাবারও শ্যামল কান্তিকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবলো না? তাঁর পরিচয় শুধু শিক্ষক না, প্রথমে তিনি একজন মানুষ, তারপর তাঁর পেশা। বিষয়টি এমন যে, কেউ যদি শিক্ষক না হোন, তাঁর অপমানবোধের মাত্রা খানিকটা কমে যায়! কিন্তু আসলে তা ঠিক না, একজন মানুষ, তিনি যে পেশারই হোন না কেন, তাঁর নিজের আত্মসম্মানবোধ আছে, আছে সামাজিক সম্মান, তা পাবলিকলি ক্ষুণ্ণ করার অধিকার কেউ রাখেনা।

আরেকটি বিষয়েও খুব আশ্চর্যবোধ করেছি, কেউ একবারও সেই সাংসদ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন না? তিনি একজন সংসদ সদস্য, তাঁর পদটি খুবই সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল একটি পদ। এভাবে পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে এদেশের একজন নাগরিককে তিনি কোনভাবেই লাঞ্ছিত করতে পারেন না, অধিকার রাখেন না।

আমরা সবাই অবগত আছি যে আমাদের দেশে ধর্ম অবমাননা নিয়ে একটি আইন বিদ্যমান আছে, যা ব্লাস্ফেমী আইন নামেই অনেকটা পরিচিত। আসুন দেখি সেই আইনটি কি বলেঃ

১৮৬০ সালের পেনাল কোডঃ

295. Whoever destroys, damages or defiles any place of worship, or any object held sacred by any class of persons with the intention of thereby insulting the religion of any class of persons or with the knowledge that any class of persons is likely to consider such destruction, damage or defilement as an insult to their religion, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.

295A. Whoever, with deliberate and malicious intention of outraging the religious feelings of any class of the citizens of Bangladesh, by words, either spoken or written, or by visible representations insults or attempts to insult the religion or the religious beliefs of that class, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both. (এটা মূল ১৮৬০ আইনে ছিলোনা, কিন্তু ১৯২৭ সালে যোগ করা হয়)

296. Whoever voluntarily causes disturbance to any assembly lawfully engaged in the performance of religious worship, or religious ceremonies, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to one year, or with fine, or with both.

297. Whoever, with the intention of wounding the feelings of any person, or of insulting the religion of any person, or with the knowledge that the feelings of any person are likely to be wounded, or that the religion of any person is likely to be insulted thereby, commits any trespass in any place of worship or on any place of sculpture, or any place set apart for the performance of funeral rites or as a depository for the remains of the dead, or offers any indignity to any human corpse, or causes disturbance to any persons assembled for the performance of funeral ceremonies, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to one year, or with fine, or with both.

298. Whoever, with the deliberate intention of wounding the religious feelings of any person, utters any word or makes any sound in the hearing of that person or makes any gesture in the sight of that person or places any object in the sight of that person, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to one year, or with fine, or with both.

সুতরাং বাংলাদেশের দন্ডবিধি অনুযায়ী, ধর্ম অবমাননা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এবং তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষীর ওপর বিবেচনা করে আদালত আইন অনুযায়ী বিচার করবেন। কিন্তু আদালত ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি কিংবা সরকারী কোন কর্মকর্তা কাউকে শাস্তি প্রদান করার ক্ষমতা রাখেন না।

সেলিম ওসমান পারতেন শ্যামল কান্তিকে গ্রেফতার করাতে। শ্যামল কান্তি ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করে থাকলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতেন সাংসদ। মামলাটি আদালতে যেতো, আদালত বিচার করতেন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। কিন্তু এই পথে হাটতে সেলিমের পছন্দ হয়নি। নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন আইন। ভাবখানা এমন, যে আমিই সরকার, আমিই আদালত এবং আমিই আইন।

এই সাংসদের পক্ষে আবার জুটেছে হেফাজতে ইসলাম নামের দলটি। যেই দলটি বরাবরই সরকারের বিরোধিতা করে এসেছে সব সময়, ছড়িয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা। সেই ছাত্র রিফাত, যাকে নিয়ে এতো কান্ড, সে এখন আবার বলছে ভিন্ন কথা, হেফাজতের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দিচ্ছে বক্তৃতা। সবমিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা।

কিন্তু আমি কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারিনা একজন সংসদ সদস্য কিভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে পাবলিক প্লেসে কোন নাগরিককে হেনস্তা করতে পারেন? এটি কি বাংলাদেশের আইনের অবমাননা নয়? সংবিধানকে ক্ষুণ্ণ করা নয়?  এটি কি অন্যায় নয়? ও এই সাংসদ সেলিম ওসমানকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই, সেই কথা নাহয় আরেকদিন বলবো। আজ এই পর্যন্তই থাক। সবশেষে আমার একটাই দাবি, সকল অন্যায়কারীর বিচার হোক আমাদের দেশের আইন মোতাবেক। সবাই ভালো থাকবেন, সাবধানে থাকবেন এবং সতর্ক থাকবেন।

Advertisements

One comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s